ক্ষমা করো আমাদের হে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার

জুলাই ১২ ২০২০, ২০:১২

Sharing is caring!

ভায়লেট হালদার : বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, টাকা বাদশার নাম ছবি খা’র অর্থাৎ একজনের ধনসম্পদে আরেকজনের মাতব্বরী। ২/৪দিন ধরে বরিশালের কিছু লোক প্রতিবাদের সারিতে ঘেমে নেয়ে একাকার। কারণ অশ্বিনী কুমার দত্তের বসতভিটায় স্থাপিত কলেজের নাম  কোনভাবেই তার নামে নামকরণ করতে দেয়া হবে না। মহাত্মা গান্ধী বরিশালে এসে বলেছিলেন, ‘সমগ্র ভারতবর্ষ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন তখন বরিশাল ছিল জাগ্রত।‘ হ্যাঁ গান্ধীজী বর্তমানেও আমরা জাগ্রত আছি, তবে দুই ভাবে জেগে থাকি। এক. আলো হাতে অন্ধকার দূর করার জন্য জেগে থাকি। দুই. অন্ধকার ভালবেসে আলোটাকে নিভিয়ে দেবার জন্য জেগে থাকি।
সরকারি বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবি নিয়ে একদল লোক মানব বন্ধন করেছেন। একদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও তারা  জড় হয়েছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও নিজেদের সুস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বিসর্জন দিয়েও তারা বরিশাল শহরের রাস্তা দখল করে প্রতিবাদী জনসভার আয়োজন করেছে। কিন্তু এই সময়ে জনসভার করার অনুমতি কিভাবে দিতে পারে প্রশাসন? কেন এই সময়ে  জনসভা? এটা জানতে হলে আমাদের যেতে বরিশালের অতীত ইতিহাসে। বরিশালের একজন মহৎ মানব আলোর পথ প্রদর্শক ও আধুনিক বরিশালের রূপকার অশ্বিনী কুমার দত্ত (জন্ম: ২৫ জানুয়ারী ১৮৫৬, মৃত্যু: ৭ নভেম্বর ১৯২৩)। ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত ‘ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশন’ (নিজ পিতার নামে) নামের একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার বর্তমানে ব্রজমোহন বিদ্যালয় (বিএম স্কুল) নামে পরিচিত। এই বিদ্যালয়টি বরিশালের দ্বিতীয় প্রাচীন বিদ্যালয়। বরিশালের মানুষকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে  ১৯৬৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে  ‘বরিশাল নাইট কলেজে’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা, একাডেমিক ভবনসহ শ্রেণীকক্ষ সংকট মোচনে ১৯৬৬ সালে একই এলাকার মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বাসভবনে ‘বরিশাল নাইট কলেজ’ স্থানান্তরিত হয়। প্রাচীন সব স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়ে বরিশাল কলেজ গড়েছে নতুন সব স্থাপনা। এই কলেজে রয়েছে ১টি একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ১টি মাস্টার্স ভবন, ১টি মসজিদ, ডাকঘর ১টি, ছাত্র সংসদ ভবন, সাইকেল গ্যারেজ, লাইব্রেরি (এক, বিশাল মাঠ এবং একটি তমাল গাছ। অশ্বিনী কুমার দত্তের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তার নিজ বসতভিটার উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন একটি স্থাপনা টিকিয়ে রাখা হয়নি। এই বরিশাল কলেজে প্রবেশ করলে এই মহাত্মার  প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা ও সৌজন্য প্রদর্শনের কোন চিহ্ন আজ আর আমাদের চোখে পড়ে না। কলেজ কর্তৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ১৯৭০ সালে দিবা শাখার কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে নৈশ শাখার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৪ নভেম্বর কলেজটি জাতীয়করণ করা হয় এবং ‘সরকারী বরিশাল কলেজ’ নামে  নামকরণ করা হয়। এভাবেই মহাত্মা অশ্বিনী কুমারের জমিতে আজ অবধি চলছে সরকারী বরিশাল কলেজে কার্যক্রম।
সমাজের মানুষের কল্যাণ ও শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি বরিশাল শহরের মধ্যে নিজ জমি দান করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্রজমোহন বিদ্যালয় (১৮৮৪) ও ব্রজমোহন কলেজ (১৮৮৯) প্রতিষ্ঠা করেন। তার গড়া এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি দীর্ঘ কুড়ি বছর বিনা বেতনে কলেজে শিক্ষাদান করেন। তিনি বরিশাল শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ও (১৮৮৭) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়। মহাত্না অশ্বিনী কুমার দত্ত তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমি কোন সন্তানের পিতা হবো না। আমি যদি পিতা হই, তাহলে আমার জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। বরিশাল এর ছেলেমেয়েরা আমার সন্তান।’ শিক্ষানুরাগী এই মহৎ মানুষটি তার সমস্ত  সম্পদ দান করেছেন মানব কল্যাণে।একটি সুন্দর সমাজ তথা নিজের শহর বরিশালকে গড়ে তুলতে জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছিলেন তিনি, দিয়েছেন শ্রম।
বেশ কয়েক বছর আগে বরিশালের সচেতন সমাজ ও সাংস্কৃতিকজনেরা এবং ভাষা সৈনিক মোশারফ হোসেন নান্নু মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের স্মৃতি ও তার আদর্শময় কর্মজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে তারই বসতভিটায় স্থাপিত সরকারী বরিশাল কলেজের নাম তার নামে নামকরণের দাবী জানান। ২০১২ সালে বরিশাল কলেজকে অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণের জন্য জাতীয় সংসদে দাবি তুলেছিলেন বরিশাল-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস। জনগণের এই দাবী আমলে নিয়ে সরকার যখন কলেজের নাম পরিবর্তনে অগ্রসর হয়েছে, তখনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে অশ্বিনী কুমার দত্তের অবদান অস্বীকার করে উত্তপ্ত বাক্য উতগীরন করছেন।  কী উদ্দেশ্য নিয়ে আপনাদের এই বিরোধিতা, প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানব বন্ধন?  অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে  নামে বরিশাল কলেজের নামকরণ করা হলে আপনাদের কার কী ক্ষতি হবে? আজকে যারা এই নামকরণের বিরোধিতা করে মানব বন্ধন সহ প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন, আধুনিক বরিশাল বিনির্মাণে এবং বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় কী কী ভূমিকা পালন করেছেন? পূর্বসূরিদের অবদান ভুলুন্ঠিত করে উত্তরসূরীদের অবদানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া যায় না। ইতিহাস মনে রাখে, ইতিহাসের পাতায় কেউ নায়ক কেউ বা খলনায়কের পাতায় স্থান পায়।
বর্তমান সময়ে যারা আলো দিশারী এই মহাত্মার অবদানসমূহকে পদদলিত করছেন, অন্ধকারের নায়ক হিসেবে তাদের নাম ভবিষ্যতে ইতিহাসের আস্তাকুড়ের পাতায় নিশ্চয়ই থাকবে। আমি রাজনীতি বুঝি না, সাম্প্রদায়িকতা বুঝি না, শ্রেণিশত্রু বুঝি না। শুধু বুঝি মানুষ, কেউ কেউ ত্যাগী ও মহৎ মানুষ। যাদের অবদানে ও অশেষ পরিশ্রমে আমরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হই এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে মস্তক অবণত করি। আমার জন্মস্থান বরিশাল শহরের সকল দানবীর, আলোকিত মানুষ এবং যারা মানব কল্যাণে সর্বদাই নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন, তাদের সকলের জন্য আমি গর্বিত। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে এই মহামানবদের ত্যাগ, আদর্শ, কর্ম আমাকে অনুপ্রাণিত করে, পথ দেখায়। আমি সেই পথের একজন যাত্রী মাত্র। আলো নিভিয়ে দিয়ে বরিশালকে অন্ধকারে নিমজ্জিত শক্তিকে রোধ করতে বরিশালের সচেতন সমাজ যুগ যুগ ধরে  জাগ্রত আছে এবং থাকবে।
দৈন্য ও হীনমণ্য চিন্তার প্রকাশে আমরা উদার, ক্ষমা করো আমাদের হে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার।


লিড আরও

shares