পল্টু আমার ইয়ার

আগস্ট ১২ ২০২০, ১৯:৩৭

Sharing is caring!

বিধান সরকার : বুক জোড়া হৃদয় যা ছিল আকাশ ছোঁয়া। কথা বলতে গিয়ে কখনো খেই হারিয়ে ফেলতেন। চলমান জামানায় সত্য বলতেন অকপটে। কত যে স্বপ্ন। ফুটবলার হতে পারেননি। তবে গানে একদিন সুনাম কুড়াবেন। এজন্য একদিন আর দুইদিন, কত রজনী পাড় করেছেন সুর ভাঁজতে গিয়ে। কুমার বিশ্বজিতের সব গানই তার নখদর্পণে। কনসার্ট হবে আমানতগঞ্জ মুরগির ফার্মের মাঠে। মঞ্চ হবে, উন্নত সাউন্ড সিস্টেম থাকবে আরো কত কি! হয়ে ওঠেনি। তবে আইনজীবীদের কোন এক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিলেন। আমাকে দেখিয়েছিলেন সেই ভিডিও রেকর্ড। ফোন দিলে সোলে ছবির সেই কমন ডায়লগ-‘সরকার আমার জন্য কত টাকার এনাম ঘোষণা করেছে, পুরো পঁচাশ হাজার’? আর কুমার বিশ্বজিতের সেই গান-‘ও ডাক্তার যখন আপনি করবেন আমার ওপেন হার্ট সার্জারী’ থেকে কিশোর কুমারের ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’। কখনোবা আইউব বাচ্চুর দু-চারখানা গান হয়ে গুরু আযম খানের ‘ওরে মালেকা ওরে সালেকা’ বা ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে জন্মে ছিল একটি ছেলে’ আরো কত কি। এই হলেন আমার ইয়ার পল্টু। কেতাবী নাম আ.হাই নেগাবান। মঙ্গলবার ১১ই আগস্ট শোকের মাস, বেলা ১১টায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সাতলার বিমল দা বা চাখারারের শ্রীমন্ত পাল জেনেছেন কিনা, জানিনে। নাজমা বলতে যে মেয়েটি কষ্টের দিনগুলোয় তার খাবার জুগিয়েছে খবরটি সে হয়তোবা ইতিমধ্যে পেয়েছে। তবে যারা জেনেছেন, তাদের হৃদয়ে ব্যথার ঝড় তুলেছে। প্রাণবন্ত আর অপার সম্ভাবনার যে সমাপ্তি হলো সেনিয়ে সব্বাই একমত হয়েছেন।

কি-ই বা বয়স। সবে পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। এই জীবনে প্রথমে মাকে তারপর বাবা, প্রিয় ছোট ভাই লিটনকে হারানোর বেদনা তাকে বেশ করে ছুঁয়েছিল। তবুও লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য কঠোর অধ্যাবসয় চালিয়েছেন। স্বজনের দায় মাথায় নিয়েও অকপটে হাসতে পারতেন। ওই হাসির নেপথ্যে আহাজারি বা বেদনা বহমান থাকলেও কখনো আন্দাজ করতে পারিনি। অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করতেন। ঠিকাদারী করেছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে। সরকার পরিবর্তনে তার পাওনা বিল আটকে দিয়েছিল। সেও প্রায় দুই দশক আগেকার কথা। হয়তোবা ওই বকেয়া পাওনা পল্টুকে সংসার বিমুখ করেছিল, অনেকটা অনটনে ফেলেছিল। তাই বলে নৈতিকতার কখনো বিসর্জন আজ অবধি দেননি। আত্মসমালোচনা করতে পারতেন বুক চেতিয়ে। উপমায় একদিন একটি গল্প ফেঁদেছিলেন যা পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বেশ সাড়া পড়েছিল। তাহলো-তিন রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত একটি বাড়ি লুট করতে গিয়েছিল। বিএনপি দলীয় লোকটি সোনা গহনা যা ছিল তা নিয়ে চম্পট দেয়। জাতীয় পার্টির সমর্থক অবশিষ্ট থাকা টেলিভিশনটি নিয়ে দে ছুট। আর আওয়ামীলীগের ব্যক্তিটি গিয়ে দেখে একটি ঢোল পড়ে আছে। তিনি আপন মনে বসে ঢোলটি বাজাতে থাকল। পুলিশ এসে শেষোক্ত ব্যক্তিটিকে বাড়ি লুটের দায়ে আটক করে নিয়ে গেল। ‘আওয়ামীলীগ বাজায় ঢোল’ এই শিরোনামের মধ্যদিয়ে নিজ দলের নেতাদের মানসিকতার কথা পেড়েছিলেন। আক্ষেপ ছিল বেশ। বুক চেতিয়ে ভোটের বাক্স পাহাড়া দিয়েছেন যার জন্য নির্বাচনে জেতার পর সেই নেতা নামটি পর্যন্ত মনে রাখেনি। অথচ এই নগরীতে পল্টু নেগাবান বলতে ফেলনার লোক ছিলেন না কখনোই। প্রচলিত চাটুকারিতায় একদম বিশ্বাস করতেন না বিধায় রাজনৈতিক পদ পদবী পরবর্তীতে তার ভাগ্যে জোটেনি। সম্প্রতি তিনি আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হয়েছিলেন। এনিয়ে আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদের সদস্য সৈয়দ আনিচুর রহমান বলেন, এপিপি হবার পর পছন্দের কোর্ট পেতে দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামীলীগের অভিভাবক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র কাছে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেছিলেন। সে অনুযায়ী কাজও হয়েছিল। বেজায় খুশী হয়েছিল পল্টু। কিন্তু সম্ভাবনার অপমৃত্যু হলো বলে আক্ষেপ করলেন এই নেতা।

পল্টুর এক সহযোদ্ধা জানালেন, সব কিছুতে যখন অন্ধকার দেখছেন ঠিক সেই সময়ে অগ্রজের মত আইনজীবী হবার স্বপ্ন দেখলেন। অধ্যাবসয় বলতে প্রতিদিন আট ঘন্টা পড়ালেখা করেছেন। এবং জেনে শুনেই পল্টু আইনজীবী হয়েছেন। ইংলিশে উপস্থপনা করতেন। নয়-ছয় বা দালালি এসব ছিল চিন্তার বাইরে। মৃত্যুর পর পল্টুর একান্ত রিক্সা চালক বলেন, মামায় যখন হাতেম আলী কলেজে ল পরীক্ষা দিতে যেতেন ঠিক মত ভাড়া দিতে পারতেন না। তবে আইনজীবী হবার পর তাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। বিমর্ষ এই রিক্সাচালকের উক্তি-পল্টু মামায় বলতো, তোরা আমার বিপদে সহায়তা করেছিস তোরাই আমার প্রকৃত বন্ধু। সব প্রতিকুলতা কাটিয়ে আইন পেশায় যখন কিছুটা ভালো করতে থাকলেন, স্বচ্ছলতা ফিরে পেলেন তখন তার একনিষ্ঠ সবুজের উক্তির উপমা টানতেন প্রায়ই। তাহলো-গরম জিলাপী দেখে খাবার ইচ্ছা জেগেছিল অসহায় থাকার কোন একদিন। তখন সবুজ বলেছিল,এখন টাকা নেই তাই জিলাপী খেতে পারছেন না, আর যখন টাকা হবে তখন আপনি চাইলেও জিলাপী খেতে পারবেন না। যার অর্থ ক্রিড়াবিদ এই লোকটির দেহে পরবর্তীতে ডায়াবেটিস রোগে বাসা বেঁধেছিল। চোখেরও অপারেশন করাতে হয়েছিল।

পল্টুর বাবা অধ্যাপনা করাতেন চাখার সরকারী কলেজে। ওখানেই তার বাল্যে বেড়ে ওঠা। সেখানের আরেক অধ্যাপকের ছেলে বিমল দা, সহপাঠি শ্রীমন্ত পাল এদের সাথে সখ্যতা গড়েছিল বেশ। তাইতো এদের কথা খুউব করে মনে রেখেছিলেন পল্টু। কতদিন বলেছিলেন, আমাকে নিয়ে চাখার যাবেন শ্রীমন্তের কষ্টে যুঝা উপাখ্যান তুলে আনার জন্য। তবে কাকতালীয়ভাবে অশ্বিনী কুমার হলে পালদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে দেখা মিলেছিল শ্রীমন্ত দাদা ও বৌদিমনির। একাত্তরে অনএয়ার হওয়া ওই স্টোরি পল্টুকে দিয়েছিলাম। বেশ খুশী হয়েছিলেন। এমনি করে খুশি হতেন ভাইয়ের এবং বোনের ছেলে মেয়েদের আব্দার মেটানোর বেলায়। সহজ কথায় যে জীবন দিলেন বিনিময়ে পেলেননা কিছু সে জীবন ছিল পল্টুর। এইতো ক’দিন আগে বলেছিলেন, সরকার আমায় নিয়ে লেখা গল্পগুলো একত্রে করে ফের নিউজ পোর্টালে দেয়ার জন্য। জবাববে বলেছিলেম-আপনাকে নিয়ে আরো কয়েকটি লেখা বাকি আছে। যেখানে আপনার এক সময়ের আয়েশি জীবন থেকে কষ্টেগাঁথা উপাখ্যান পেড়িয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ানো অধ্যায়ের কথা বর্ণিত হবে। কিন্তু সে আর হলো কৈ! হঠাৎ করে আপনি চলে গেলেন, কোন রকম সময় না দিয়ে। আমারে ব্যথিত করে।

আপনাকে শেষ বারের মত দেখে ফিরবার বেলায় আমার সহকর্মী জসিমউদ্দিন বলেছিলেন, পল্টু ভাই আপনার খুউব ভালো বন্ধু ছিলেন, বেশ পছন্দ করতেন। তাইতো অগ্রজ সাংবাদিক মহম্মদ আলী খান জসিম যখন জানালেন, পল্টু আর নেই; শত ব্যস্ততার মধ্যেও থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। হৃদয়ের তন্ত্রীতে আঘাত হেনেছে। এই সেই পল্টু যার সাথে দিনের পর দিন কখনোবা মধ্যরাত পর্যন্ত গল্প করেছি, তার স্বপ্নের কথা শুনেছি। সে জীবনের আজ সমাপ্তি হলো। এমনটা সত্যিই চাইনি আমার সত্যিকার ইয়ার পল্টু। কি বলবো; আর তো কিছু নেই যে আমার বন্ধু। তবে আপনি উপমায় ফিরবেন দীর্ঘদিন বহু ঘটনায়, অনেক হৃদয়ে।

লেখক: সাংবাদিক ও গল্পকার


লিড আরও

shares