১১ বছরেও ভাঙা যায়নি গোপনীয়তার সংস্কৃতির শৃংখল

সেপ্টেম্বর ২৯ ২০২০, ১৩:১৬

Sharing is caring!

মাসুক কামাল: অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তথ্য অধিকার আইন আলোর মুখদেখেছে তা প্রায় যুগ ছুইছুই। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় এ আইনটি শক্তিশালী হাতিয়ার হওয়ার কথা থাকলেও জনজীবনে তা কতটুকুই ভূমিকা রাখছে? শুধুমাত্র প্রচার ও চর্চার অভাবে রাষ্ট্র-নাগরিক উভয়ই এআইনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বহুদিন ধরে প্রচলিত ‘গোপনীয়তার সংস্কৃতি’ আমাদের দারিদ্র্য ও দুর্নীতিকে উৎসাহ যুগিয়ে আসছে।
অপর দিকে অবাধ তথ্য প্রবাহ আমাদের দারিদ্র্য দুরীকরনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সত্যিকারের জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। যা সর্বস্তরে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি করে। তাই তথ্যের প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি বিষয়। এ আইনটির বহুল চর্চা থাকলে প্রথম দিকে দূর্নীতির ঘটনা উল্লেখযোগ্যহারে দৃশ্যমান হলেও প্রতিনিয়তই তা কমে আসতো। নিত্যনতুন দূর্নীতির ঘটনা সরকারের অর্জন ম্লান করে দিতে পারতো না। তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের দায় শুধু সরকারের না, নাগরিকেরই বেশী। তবে তথ্য অধিকার আইনের মত শক্তিশালী আইন জনজীবনে কাজে লাগানোর সুফল সম্পর্কে জনগণকে জানানোর দায় সরকারেই বেশী। জেলা উপজেলায় তথ্য অধিকার আইন নিয়ে যে কমিটি তা কতটুকু কাগজে আর কতটুক গণমূখী তা দিবস পালনের কর্মসূচিতে স্পষ্ট হয়। বহুদিনের গোপনীয়তার সংষ্কৃতি শৃংখল ততক্ষণ ভাঙবে না যতক্ষন পর্যন্ত চাকচিক্য ও বিলাসী জীবনের মোহমুক্ত নিবেদিত কর্মীবাহীনি দেশ ও দশের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। গোপনীয়তার সংষ্কৃতিকে লালন করে বিলাসী জীবনের নিশ্চয়তার প্রতিযোগিতায় নিজের দ্বায়িত্ববোধ টুকু হারিয়ে ফেলে।

চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতার অধিকার জনগনের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে বাংলাদেশ সংবিধানে স্বীকৃত এবং তথ্য জানার অধিকার হচ্ছে চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতার অধিকার অর্জনের অন্যতম শর্ত এবং তা নিশ্চিৎ করতে তথ্য অধিকার আইন তৈরী হয়েছে। এখন এ আইনটি কার্যকর করার মাধ্যমে গণমানুষের মাঝে এর সুফল পৌছে দেয়ার দ্বায়িত্ব এড়ানো যাবেনা। আমরা তথ্য অধিকার আইন পেয়েছি, একটি স্বাধীন কমিশন পেয়েছি কিন্তু একে তৃণমূলের মানুষের কাজে লাগাতে না পারলে এত দিনের বহুকাঙ্কিত প্রাপ্তিকে হেলায় হারানো হবে। এ আইনটির ব্যপারে গনমানুষকে জানানোর উদ্যোগ এখনও উল্লেখযোগ্য হারে ছিল না। যদি মানুষের মধ্যে এ সম্পর্কে সহজ ধারনা না থাকে তাহলে এর সুফল তৃণমূল স্তরে পৌছানো কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া বহুদিনের প্রচলিত গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতিকে জন-জীবনে তথ্যকে কাজে লাগানোর সংস্কৃতি তৈরী করার চর্চার বিকল্পনেই। তথ্য কিভাবে মানুষের অধিকার নিশ্চিৎ করে, গণতন্ত্রে প্রকৃত জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, সর্বন্তরে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরীর মাধ্যমে দারিদ্রতা ও দূর্নীতি প্রতিরোধে কিভাবে এ আইন কাজে লাগানো যায় এ রকম আরও অনেক বিষয় আছে যা তথ্য আধিকার আইন বাস্তবায়নে সহায়ক সেই বিষয় সম্পর্কে গনমানুষকে সচেতন করতে সরকারি-বেসরকারি কার্যকর গণমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। কমিশনের উচিৎ এখন সকল মহলের বিশেষকরে যারা তথ্য অধিকার আইনের দাবীতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে তাদের সংগঠিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এ আইনের ব্যপারে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গণসচেতনতা তৈরী ও নাগরিক জীবনে এ আইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিৎ করা।

তথ্য অধিকার আইন হয়েছে, এখন চাইলেই আমরা আজই প্রচলিত গোপনীয়তার সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে পারবনা। ফলপ্রসু উদ্যোগের মাধ্যমে সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিৎ করা। তা না করতে পারলে আমাদের দেশের অনেক আইনের মত কাগজে কলমেই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা উরিয়ে দেয়া যায় না। তথ্য অধিকার আইন এখনও সম্পুর্ন নতুন একটা বিষয়, অনেক সমস্য-সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগুতে হবে। প্রতিকূল পরিস্থিতি, সার্থান্বেষী মহলের রক্তচক্ষু, অসহযোগীতামূলক আচরন, নতুন নতুন জটিলতার সৃষ্টি এরকম বহু সমস্যার মধ্যদিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। তা না হলে তথ্য অধিকার আইন সংসদে পাসের পর যারা ধরে নিয়ে ছিল এ আইন কাগজে-কলমেই থেকে যাবে কখনই তাদের দূর্নীতিতে বাঁধা হয়ে দাড়াবে না, তাদের কথাই সঠিক প্রমানিত হবে।

এ আইনের অন্যতম সুবিধা পাবে গণমাধ্যমকর্মীরা সেক্ষেত্রে এর প্রচারে তাদেরও দ্বায়িত্ব কম নয়। এ আইন সম্পর্কে জনগন অবহিত থাকলে গণমাধ্যমের অনেক নতুন বিষয় ও সংবাদ সূত্র বেড়ে যাবে। উঠে আসবে অজানা অনেক সমস্যা-সম্ভাবনার কথা। নিশ্চিৎ হবে অবাধ তথ্য প্রবাহ। নিশ্চিৎ হবে সরকারি সেবামুলক প্রতিষ্ঠান থেকে জন সাধারনের সেবা গ্রহন। তৈরী হবে জবাবদিহিতা। সর্বপরি মানুষের মানবাধিকার বাস্তবায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্নিত হবে। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ন বিষয় উন্নয়ন বেগবান হবে। সরকারি-বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ মানুষের কাজে আসবে। সরকারি অনেক সুবিধা সহজ, সূলভ ও অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও শুধূমাত্র তথ্য ঘাটতির কারনে বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত হয়েছে জনগন। আর পেশী শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে মানবাধিকার। সে সুযোগে একটি শ্রেনী হয়েছে বিপুল টাকার মালিক আর ক্ষমতাধর। বিনামূল্যে যে সেবা নাগরিকের পাওয়ার কথা তাকে অকার্যকর করে বানিজ্যিক নির্ভর করে ফেলেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বানিজ্যিকিকরনের ফলে আমাদের দেশের অবস্থা এখন কোন পর্যায়ে তা প্রত্যেক নাগরিকই হাড়েহাড়ে টের পেলেও করার কিছুই নেই। কিন্তু অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিৎ হলে নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে প্রতিটি মানুষ মানবাধিকার সচেতন হবে। প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বুঝে নিবে। সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো ফিরে পাবে তার নিজ গতিধারা। সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সরকারি সেবা কাজে লাগতে পারবে। নাগরিক অধিকার হরন করে কেউ আর আঙুল ফুলে কলা গাছ হতে পারবে না। পেশী শক্তির ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচন হবে। সাধারন মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিৎ হবে।

যেহেতু সরকারি স্বায়ীত্ব শাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তথ্যেও অবাধ প্রবাহ ও জনগনের তথ্য অধিকার নিশ্চিৎকরনের লক্ষ্যে এই আইন প্রেণিত হয়েছে। সেহেতু শুধু সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয় তথ্য অধিকার আইনের সুফল প্রভাব ফেলবে সকল কার্যক্রমে, বিশেষ করে উন্নয়ন কার্যক্রমে সচ্ছতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাতে জন অংশগ্রহন নিশ্চিৎ করবে। উন্নয়ন প্রকল্পের জবাবদিহিতা তৈরী হবে। সুষম উন্নয়ন সম্ভব হবে।

২০০৯ সালের ১ জুলাই এটি কার্যকর হয়েছে এবং একই দিনই তথ্য কমিশন গঠন হয়েছিল। এর আগে তথ্যঅধিকার আইন নিয়ে অনেকগুলো সংগঠন, নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন থেকে এ আইনের দাবী জানিয়ে আসছিল। বাংলাদেশে কি ধরনের আইন হতে পারে, তার একটি ইংরেজি ভাষায় কার্যপত্রও আইন মন্ত্রনালয় থেকে দেওয়া হয়েছিল ২০০২ সালে। কিন্তু তারপর তৎকালিন সরকার আর এটি নিয়ে এগোয়নি। ওয়ান এলেভেন এর সময় তথ্য অধিকার আইনের বিষয়ে আন্তরিকতা প্রকাশ করে একটি কমিটি গঠন পূর্বক ২০০৮ সালের ৬ মার্চ প্রতীক্ষিত এ আইনের খসড়া প্রকাশ করে। এ আইনের ওপর জনসাধারণের মতামত গ্রহণের জন্য তা তথ্য মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয় এবং কিছু ই-মেইল ঠিকানায় আগ্রহীদের অভিমত প্রকাশের আমন্ত্রন জানানো হয়। এ উদ্যোগকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। যেহেতু এ আইনের প্রধান অংশীভাগী হবেন সাধারণ মানুষ, তাই খসড়া অধ্যাদেশের ওপর সাধারণ মানুষের মতামত নেয়া, তাদেরকে অবহিত করা জরুরি মনে করে অনেক অনেক সংগঠন তৃনমূল স্তর থেকে মতামত যাচাই করে সুপারিশমালা প্রেরন করে। অতপর জনগনের দীর্ঘদিনে দাবীর প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ প্রনয়ন করেন। ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার প্রেক্ষিতে এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি তথ্য অধিকার আইনে পরিনত হয়।

তথ্য অধিকার আইন কিভাবে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভুমিকা রাখতে পারে, কিভাবে দূর্নীতি প্রতিরোধ করে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ কিভাবে মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিৎ করে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে, এ আইন সকল স্তরে জবাবদিহিতা তৈরী করতে যে ভূমিকা রাখতে পারে এধরনের বিষয়গুলো সম্পর্কে সকলকে অবহিতকরনের মাধ্যমে এ আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব। এখন আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবনার সময়। বেসরকারি সংস্থাসমূহ বিশেষকরে যারা তথ্য অধিকার আইনের দাবী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছেন, তাদের এখন গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখার বিকল্প নেই। তাছাড়া এ আইনের প্রচারনার ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রনালয় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। যার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে এ আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হতে পারে। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান সমূহে কর্মরতদের এ আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী এবং সমন্বয়কারী, যুব নাগরিক আধিকার জোট, বরিশাল।


লিড আরও

shares