বরিশালের তৃণমূলেও শুদ্ধি অভিযান চায় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা

September 26 2019, 18:40

বরিশাল রিপোর্ট ॥ ঢাকায় ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার প্রভাব পরেছে বরিশালেও। আওয়ামী লীগের কতিপয় হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী নেতার ছত্রছায়ায় বরিশালে যারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জুয়া ও মাদকের কারবারের সাথে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন দলের তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা।
বিরোধী দলের সময়ে যারা মাঠে ছিলেন না অথচ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এতোদিনে যারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন তাদের হাইব্রিড নামে আখ্যায়িত করে এদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালানোর জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে জোর দাবি করা হয়েছে। সূত্রমতে, গত কয়েকদিন ধরে নগরীর জুয়ার আসর আর সরকারী দপ্তর থেকে অনেকটা গা ঢাকা দিয়েছে কথিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামধারীরা। পুলিশ ইতোমধ্যে নগরীর দুটি ও উজিরপুরের একটি স্পটে অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করেছে। এ অভিযানের পর আতঙ্কে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে। একইভাবে হতাশা বিরাজ করছে ক্ষমতার আমলে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে ক্ষমতার প্রভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া কতিপয় একটানা বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের মাঝে।
বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দলের মধ্যকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের দুর্নীতি, জুয়াড়ি ও মাদক বিক্রেতাদের চিহ্নিত করতে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় কাজ চলছে। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে প্রতিদিন এক শ্রেণির যুবককে অবস্থান করতে দেখা যেতো। অনেকটা সাহেবি কায়দায় অবস্থান করা এসব যুবক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামধারী। দলে তাদের কোনো পদ পদবী না থাকলেও তারা নিজেদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী পরিচয় দিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জুয়ার রমরমা বাণিজ্য করে আসছিলো।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার নগরীর শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর ঘুরে এতোদিনের ওইসব ছাত্র ও যুবলীগের নামধারীদের কোথাও দেখা যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে সব সরকারী দপ্তর নিয়ন্ত্রণ করেছে এক শ্রেণির ছাত্র ও যুবলীগের নামধারীরা। এদের কারণে ঠিকাদারী কাজ সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব ছিলোনা। মূলত উন্নয়ন কাজ টেকসই হয়নি ওইসব কথিত নেতাদের কারণেই। ঠিকাদাররা আরও জানান, চলমান অভিযানের পর গত কয়েকদিন ধরে নামধারী ওইসব নেতারা গা ঢাকা দিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর নাজিরের পুল, কাউনিয়া, আমানতগঞ্জ, বাংলাবাজার, কালুশাহ সড়ক, জেলখানার মোড়, আলেকান্দা, চাঁদমারী, নতুনবাজার ও কাশিপুরে বেশ কয়েকটি জুয়ার আসর বসে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কথিত নেতাদের ছত্রছায়ায়। সম্প্রতি সময়ে রাজধানীতে অভিযানের পর পরই নগরীর প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার ক্লাবে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য, জুয়ার সরঞ্জাদিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অপর এক অভিযানে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতাসহ নয়জনকে জুয়ার আসর থেকে গ্রেফতার করেছে। এ দুটি অভিযানের পর গত কয়েদিন ধরে অন্যসব জুয়ার আসর ফাঁকা হয়ে গেছে।
বিএম কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল আহমেদ মুন্না বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বরিশালে ছাত্রলীগের কোন ইউনিটেই কমিটি নেই। তাই সবাই এখন নিজেদের নেতা বলে পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম করছে। এতে করে ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতাকর্মীদের চরমভাবে ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হলে নতুন নেতৃত্বের কোন বিকল্প নেই। নতুন কমিটি গঠণ করা হলে ওইসব অনুপ্রবেশকারী সুবিধাভোগিরা নিজেদের ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে কোন ধরনের অপর্কম করতে পারবেনা। অপর এক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, আট বছর ধরে এখানে কমিটি নেই। তাছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কমিটি না থাকলেও নামধারীরা ছাত্রলীগের প্রভাবখাটিয়ে একের পর এক আপত্তিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর গড়ে তুলে আওয়ামী লীগের ভাবমুর্তিক্ষুন্ন করছে অনুপ্রবেশকারীরা।
মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, আমার কমিটির মেয়াদ আট বছর অতিবাহিত হলেও এ অঞ্চলের নেতারা কমিটি দিতে চাননা। বেশ কয়েকবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিলেও তা অনুমোদন দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদককে ডাকা হয়না। বরং যাদের পদ নেই সেইসব অনুপ্রবেশকারীরাই এখন প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা। তিনি আরও বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেসব ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নামে বিশৃঙ্খলা করা হয়, তারা অনুপ্রবেশকারী। এছাড়া জেলখানার মোড়, কালুশাহ সড়ক, চাঁদমারী, আলেকান্দা জুয়ার আসর চলে। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েক নেতার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বরিশালেও শুদ্ধি অভিযান দরকার।
মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, শুদ্ধি অভিযান বরিশালেও হোক এটা আমরা চাই। বরিশালে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের কর্তৃত্বের অবসান হওয়ার দরকার। যারা টেন্ডারবাজি, জুয়াবাজি করে তারা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের গ্রেফতার করুক এটাই আমরা চাই। নগরীর বহুতল ভবনে যারা বার বানিয়ে জুয়ার আসর বসায় তারা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। তাদেরও দলের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করা হবে।
এ ব্যাপারে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, হাইব্রিড, লুটেরা দলে থাকবে না। সরকারের এ ধরনের অভিযানকে বরিশালের আওয়ামী লীগ স্বাগত জানায়। বরিশালে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতৃত্ব না থাকলেও অনুপ্রবেশকারীরা অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায় নিয়ন্ত্রণ করছে। যারা এ ধরনের অপকর্ম করছে তারা হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী। তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ক্যাসিনোর আদলে বরিশালে জুয়ার আসর যারা বসায় তারা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেফতার করবে বলে মহানগর আওয়ামী লীগ আশা করে।
উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বরিশালের সর্বত্র আওয়ামী লীগের কতিপয় সুবিধাভোগি নেতার হাত ধরে ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী সন্ত্রাসী, বহুল আলোচিত ছাত্রলীগ নেতার প্রধান হত্যাকারী থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা যোগদানের নামে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে। পরবর্তীতে ওইসব অনুপ্রবেশকারীরা একের পর এক বির্তকিত কর্মকান্ড করে আসছে। একসময় যাদের হাতে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন সেইসব অনুপ্রবেশকারীরাই কতিপয় জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় মাঠপর্যায়ে একক আধিপত্য বিস্তার করে অঢেল অর্থের মালিক বনে গেছেন। যেকারণে ওইসব কতিপয় বির্তকিত জনপ্রতিনিধিদের কারণে দলের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে রাজনীতি থেকে নিজেদের অনেকটাই আড়াল করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও তার সকল সহযোগি সংগঠনের প্রকৃত ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা।